দেনমোহর নিয়ে ইসলাম যা বলে ======ইসলাম ধর্মে পালনীয় বিষয়ের মধ্যে বিয়ে অন্যতম এবং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর বিয়েতে ইসলাম যে সব নিয়ম-কানুন আরোপ করেছে, তন্মধ্যে দেনমোহর উল্লেখযোগ্য।দেনমোহর স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রীর একটি বিশেষ অধিকার। সাধারণত বর ও কনের সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী দেনমোহর নির্ধারিত হয়। মুসলিম বিয়েতে এটি একটি বাধ্যতামূলক শর্ত। দেনমোহর হিসেবে যেকোনো পরিমাণ অর্থ নির্ধারণ করা যায়। দেনমোহর নির্ধারণের সময় সামাজিক মর্যাদা এবং বাবার পরিবারের অন্যান্য নারী সদস্যের দেনমোহরের পরিমাণ বিবেচনা করতে হবে। তা ছাড়া প্রয়োজনে আদালতের মাধ্যমে দেনমোহর নির্ধারণ করা যায় কিংবা স্বামী কর্তৃক যেকোনো সময় দেনমোহরের পরিমাণ বৃদ্ধি করা যায়। মুসলিম বিয়েতে বিয়ের পর অবশ্যই স্ত্রীকে উপযুক্ত দেনমোহর দিতে হবে।পবিত্র কোরআন ও হাদিসে দেনমোহর দেওয়ার ব্যাপারে এবং এতে অবহেলা না করতে জোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিয়ের শর্ত হলো দেনমোহর, স্ত্রীর ভরণপোষণ, তার ইজ্জত-আবরুর হেফাজত ইত্যাদি। সুতরাং যথাসময়ে এসব পূরণ করতে হবে। পবিত্র কোরআনে দেনমোহর আদায়ের বিষয়ে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা নারীদেরকে সন্তুষ্টচিত্তে মোহর প্রদান করো।’ -সূরা নিসা: ৪ইসলামে মোহরমুক্ত কোনো বিয়ের অস্তিত্ব নেই। কেননা মোহর বিয়ের জন্য আবশ্যকীয় বিধানের একটি। বিয়ের সময় যদি মোহরের কথা উল্লেখ নাও করা হয় তথাপি মোহর আবশ্যক। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) জীবনে যে এগারোটি বিয়ে করেছিলেন, তার সবগুলোতেই তিনি মোহর সুচারুভাবে প্রদান করেছেন। এমনিভাবে সাহাবারাও নিজ স্ত্রীদের মোহর প্রদানে গড়িমসি করেননি। মোহরের গুরত্ব সম্পর্কে প্রচুর হাদিস বর্ণিত হয়েছে।দেনমোহরের বিষয়টি হালকাভাবে নিয়ে লোক দেখানো ‘অধিক মোহর’ ধার্য করাতে কোনো বরকত নেই। বরং তা অহংকারের পরিচায়ক। বরকতপূর্ণ বিবাহের বর্ণনা দিতে গিয়ে উম্মাহাতুল মুমিনীন হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘সবচেয়ে বরকতময় বিয়ে হচ্ছে সুন্নতি বিয়ে, অর্থাৎ যে বিয়েতে খরচ কম হয় এবং কোনো জাঁকজমক থাকে না।’ -মিশকাত শরিফকোরআনের আয়াত ও হাদিস দ্বারা স্পষ্ট বুঝা যায়, দেনমোহর পুরুষের ওপর স্ত্রীর ঋন এবং এটা আদায় করা ওয়াজিব। অতএব তা আদায় না করলে স্বামী গোনাহগার হবেন এবং স্ত্রীর নিকট এই ঋণ অবশিষ্ট থেকে যাবে। তবে হ্যাঁ, যদি স্ত্রী স্বেচ্ছায় মোহরের দাবী ছেড়ে দেয়, তবে স্বামীর ওপর এর বাধ্যকতা অবশিষ্ট থাকবে কিন্তু স্ত্রীকে মোহর ক্ষমা করে দেওয়ার ব্যাপারে বাধ্য করা কিংবা মোহর আদায় করতে অস্বীকৃতি জানানো- অমার্জনীয় অপরাধ।এ প্রসঙ্গে কোরআনে ইরশাদ হয়েছে,وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً ۚ فَإِنْ طِبْنَ لَكُمْ عَنْ شَيْءٍ مِنْهُ نَفْسًا فَكُلُوهُ هَنِيئًا مَرِيئًاওয়া আ-তুন নিছাআ সাদুকা-তিহিন্না নিহলাতান ফাইন তিবনালাকুম ‘আন শাইইম মিনহু নাফছান ফাকুলূহু হানীআম মারীআ।আর তোমরা স্ত্রীদেরকে তাদের মোহর দিয়ে দাও খুশীমনে। তারা যদি খুশী হয়ে তা থেকে অংশ ছেড়ে দেয়, তবে তা তোমরা স্বাচ্ছন্দ্যে ভোগ কর।——–সূরা নিসা: ৪দেনমোহর পরিশোধের ব্যাপারে আমাদের মধ্যে রয়েছে চরম অজ্ঞতা কিংবা সজ্ঞান উদাসীনতা। নিয়মিত নামাজ-রোজা আদায় করেন এমন অনেক মানুষও দেনমোহরের বিষয়ে সচেতন নন। এ বিষয়ে উদাসীনতা এতো প্রকট যে, তারা নফল নামাজ পড়াকে যতোটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন,স্ত্রীর মোহর আদায়কে তার সিকিভাগও গুরুত্ব দেন না।এ ছাড়া দেনমোহর নিয়ে আরও ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। যেমন বরের এক লাখ টাকা দেনমোহর পরিশোধের ক্ষমতা আছে, কিন্তু কাবিননামায় কনে পক্ষের সামাজিক মর্যাদা রক্ষার অজুহাতে জোরপূর্বক লেখানো হয় আরও বেশি। কনেপক্ষ ভাবে, মোহরানার অর্থ বেশি হলে বর কখনও কনেকে তালাক দিতে পারবে না। আর ছেলের পক্ষ ভাবে, যতো খুশি মোহরানা লিখুক। ওটা তো আর পরিশোধ করতে হবে না। এমন মনোভাব কোনোভাবেই কাম্য নয়।মোহর পরিশোধ না করার নিয়তে যে স্বামী অধিক পরিমাণ মোহর নির্ধারণপূর্বক স্ত্রীকে বিয়ে করে তার সঙ্গে দাম্পত্য জীবন শুরু করে, সেটা আসলে প্রতারণার মাধ্যমে দাম্পত্য জীবন শুরুর শামিল। কেননা, দেনমোহরের কারণেই স্ত্রী তার স্বামীর জন্য হালাল হয়েছিল। অতএব দেনমোহরই যেখানে পরিশোধ করা হলো না, সেখানে স্ত্রীর সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক হালাল হয় কিভাবে?অনেক স্বামী আবার মনে করেন, স্ত্রীর ভরণ-পোষণসহ যাবতীয় ব্যয়ভার তো তিনিই বহন করছেন। অতএব এর মধ্যে আবার আলাদা করে তাকে মোহর পরিশোধ করতে হবে কেন? না, মোহরের সঙ্গে ভরণপোষণের কোনো সম্পর্ক নেই। দু’টি সম্পূর্ণ আলাদা অধিকার, দু’টোই স্বামীকে বহন করতে হবে।দেনমোহর দুই প্রকার। একটি তাৎক্ষণিক দেনমোহর, যা স্ত্রীর চাওয়ামাত্র পরিশোধ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্ত্রী তাৎক্ষণিক দেনমোহর না পাওয়া পর্যন্ত স্বামীর সঙ্গে দাম্পত্য জীবন শুরু করতে অস্বীকার করতে পারেন।আরেকটি হচ্ছে বিলম্বিত দেনমোহর। বিলম্বিত দেনমোহর বিবাহবিচ্ছেদ অথবা স্বামীর মৃত্যুর পর পরিশোধ করতে হয়। এ ছাড়া স্বামী সালিসিপরিষদের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে স্ত্রীকে বিলম্বিত দেনমোহর পরিশোধ করতে হবে।সাধারণত দেনমোহরের কিছু পরিমাণ বিয়ের সময় তাৎক্ষণিক দেনমোহর হিসেবে দেওয়া হয় এবং তা কাবিননামায় লিখিত থাকে। বাকিটা বিলম্বিত দেনমোহর হিসেবে ধরা হয়।আইন অনুযায়ী দেনমোহর স্বামীকে অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে। কারণ, দেনমোহর সব সময়ই স্বামীর ঋণ। স্ত্রী পারিবারিক আদালতে মামলা করে দেনমোহর আদায় করতে পারবেন। দেনমোহর দাবি করার পর স্বামী ওই দাবি পরিশোধ না করলে স্ত্রী স্বামীর কাছ থেকে পৃথক থাকতে পারবেন এবং ওই অবস্থায় স্বামী অবশ্যই তার ভরণপোষণ করতে বাধ্য থাকবেন।এ ছাড়া বিয়ে বিচ্ছেদ হলে বা স্বামীর মৃত্যু হলে স্ত্রী তার দেনমোহর আদায়ের জন্য পারিবারিক আদালতে মামলা করে তা আদায় করতে পারেন। স্বামীর মৃত্যু হলেও বকেয়া দেনমোহর একটি ঋণের মতো। এটি শোধ করতেই হয়। স্বামীর উত্তরাধিকারীরা এটি প্রদানে বাধ্য। অন্যথায় মৃত স্বামীর উত্তরাধিকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করে আদায় করা যায়।এমনকি স্ত্রী আগে মারা গেলেও দেনমোহর মাফ হয় না। স্ত্রীর উত্তরাধিকারীরা এই দেনমোহরের হকদার। তারাও মামলা করার অধিকার রাখেন।দেনমোহর নির্ধারণ হয় দু’পক্ষের আলোচনার ভিত্তিতে। এর সর্বনিম্ন পরিমাণ নির্ধারিত আছে; সর্বোচ্চ পরিমাণের কোনো সীমা নেই। এই যে ‘দু পক্ষের আলোচনা’ -এরও একটা ভিত্তি থাকে। তা হলো, পরিবারের সমপর্যায়ের অন্যান্য মহিলাদের দেনমোহর -যেমন, চাচী, ফুফু, খালা, বোন ইত্যাদি। রূপে, গুণে তারা যদি সমান হয়, তাহলে তাদের দেনমোহরের সাথে মিল রেখে একটা অঙ্ক নির্ধারণ করা যেতে পারে।ইসলাম দেনমোহরের বিধান দিয়েছে নারীর জীবনের সিকিউরিটির জন্য। কোনো কারণে দাম্পত্য বন্ধন ভেঙে গেলে যেন তাকে পথে বসতে না হয় -সে জন্যই এ ব্যবস্থা। আমার অন্য এক লেখায় এটাকে অনেকটা লাইফ ইন্সুরেন্সের সাথে তুলনা করেছিলাম।দেনমোহর নারীর অধিকার। এ থেকে তাকে বঞ্চিত করা যায় না। এ জন্যই বিবাহে কেউ যদি দেনমোহর নির্ধারণ নাও করে, কিংবা, এরকম বলে যে, ‘এ বিবাহে কোনো দেনমোহর থাকবে না’ -তবু তাতে দেনমোহর দিতে হয়।দেনমোহর নির্ধারণের সময় সঙ্গতিপূর্ণ দেনমোহর নির্ধারণ করা উচিৎ। শুধু লোক দেখানোর জন্য কোটি টাকা দেনমোহর নির্ধারণ করা, এরপর, প্রথম রাতেই ৯৯ লক্ষ ৯৯ হাজার টাকা মাফ করিয়ে নেয়া- এগুলো মানবতা বিবর্জিত ঘৃণিত কাজ। অতএব শুধু অঙ্কের দিকে না তাকিয়ে সামর্থ্যের দিকেও তাকানো উচিৎ।মনে রাখা উচিৎ, নবীজী স. তাঁর স্ত্রী, কণ্যাদের ক্ষেত্রে কত অল্প অঙ্ক নির্ধারণ করেছিলেন। কাজেই কম মোহরানা নির্ধারণ কোনো সম্মানহানীর বিষয় নয়। আবার মোটা অঙ্ক নির্ধারণও কোনো গর্বের বিষয় নয়। এটা কোনো সওদা বা কেনা বেচা নয় যে যত বেশি মূল্য ধরা হবে, তত মান বাড়বে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: