কেন তাকসিম মসজিদ এতো গুরুত্বপূর্ণ?

সোশ্যাল মিডিয়াতে ইদানিং দেখতে পাচ্ছি বিশেষত তরুণ প্রজন্ম তাকসিম মসজিদ ইস্যু সম্পর্কে একেবারেই অপরিচিত। “এই বিষয়টিকে কেন এত বাড়িয়ে বলা হচ্ছে”, “একটি ছোট মসজিদ, তাতে এতো কী আসে যায়” এর মত মন্তব্যগুলি যখন দেখলাম তখন এটি নিয়ে একটু বিস্তারিত জানানোর প্রয়োজন অনুভ করলাম। কারণ নতুন প্রজন্ম সাম্প্রতিক ইতিহাসই জানে না। সুতরাং, অতীতে যা ঘটেছে তা সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবেন না। আজ তুরস্কের তাকসিম মসজিদটি কেন তুরস্কবাসীর কাছে এতো গুরুত্বপূর্ণ তা নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক ।

প্রথমত জানিয়ে রাখি যে তাকসিম মসজিদ আজকের বিষয় নয়। এটি ১৫০ বছর পূর্বে শুরু হওয়া ইসলাম নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই, এবং ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করার লড়াইয়ের প্রতীক। তাকসিম / বেইওউলু অঞ্চল এমন একটি অঞ্চল যেখানে পূর্বে অমুসলিমরা বাস করত, যেটিকে ওসমানী খিলাফতের আমলে “পেরা” বলা হত। এটি বহু শতাব্দী ধরে বেশ্যাবৃত্তির কেন্দ্রবিন্দু ছিলো, কারণ এটিই একমাত্র অঞ্চল যেখানে মদ গাজা ইত্যাদি সহ সকল অপকর্মের অনুমতি রয়েছে।

দ্বিতীয়ত ওসমানী সাম্রাজ্যের দুর্বল হওয়ার সময় এটি একটি মুক্ত অঞ্চল হিসাবে বিদেশী মিশন, গুপ্তচর এবং বিভিন্ন ফর্মেশনগুলির কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীতে অটোমান-রাশিয়ান যুদ্ধের পরে রাশিয়ানরা এখানে অর্থোডক্স চার্চ নির্মান করার পরে মুসলিম জনগণের মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কারণ এই অঞ্চলে অনেক গীর্জা এবং উপাসনালয় থাকার পরেও রাশিয়ানরা তাদের নিজস্ব গীর্জা তৈরি করার কারনে বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। এই সমস্ত গীর্জা এবং উপাসনালয়গুলির বিকল্প হিসাবে মাত্র ১ টি ছোট মসজিদের (আগা মসজিদ) উপস্থিতি মুসলমানদের মর্যাদায় আঘাত হানে। এরপরে সুলতান আব্দুল হামিদ সেই সময়ে এই অঞ্চলে একটি জামে মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন। পশ্চিমা দেশগুলি এই পরিকল্পনার কথা শুনেই উসমানীয় সাম্রাজ্যকে হুমকি ধামকি দেয়া শুরু করে। পরে আর সামনে এগুনো সম্ভব হয়নি। ১৯৫২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আদনান মেন্ডেরেসের শাসন আমলে মসজিদ ইস্যুটি দ্বিতীয়বার জনসম্মুখে আনা হয়। কিন্তু আগেরবারের মতো পশ্চিমা দেশগুলির হুমকিতে আবারো পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল।

যদিও ১৯৬০ এর পরে বেইওউলু অঞ্চলের সৈন্যবাহিনী, সংখ্যালঘু এবং অমুসলিমরা এই অঞ্চলটি থেকে পুরোপুরি বের হয়ে যাওয়ার পরে মুসলিম জনগোষ্ঠী তাদের জায়গাগুলিতে বসতি স্থাপন করেছিল। কিন্তু তার পরেও মসজিদটির নির্মাণকাজ বহু বছর ধরেই বিভিন্ন বাধা বিপত্তির সম্মূখীন হতে থাকে। সুলেইমান দেমিরেল (১৯৭৯) এবং তুরগুত ওজাল (১৯৮৮) তকসিমের কাছের এই মসজিদের প্রস্তাবটি তাদের শাসন আমলে হাতে নেয়ার পরেই পশ্চিমাদের চাপ এবং দেশের মধ্যের ইসলামের শত্রু, কমিউনিষ্ট এবং বামপন্থীদের প্রচণ্ড চাপের কারণে আবারো পিছু হটার পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়। যদিও রেজেপ তাইয়িপ এরদোয়ান মেয়রত্বের সময় এবং এরবাকানের প্রধানমন্ত্রীর সময় এটিকে মূল এজেন্ডায় আনা সত্বেও ২৮ শে ফেব্রুয়ারির অভ্যুত্থানের কারণে মসজিদটি আর তৈরি করা যায়নি।

মসজিদ প্রকল্পের বিষয়টি ২০১১ সালে আবারও মামলা-মোকদ্দমার মূল বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছিল। ১৯৯৩ সালে বেইওউলুর অনেক অংশকে “নগর সুরক্ষা অঞ্চল” হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছিল। এই ঘোষণার ভিত্তিতে, সুরক্ষার জন্য উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। ২০১১ সালে, ১/১০০০ স্কেল “বেইওউলু আরবান সাইট সংরক্ষণ বাস্তবায়ন পরিকল্পনা” এবং 1/5000 স্কেল “বেইওউলু মাস্টার ডেভলপমেন্ট প্ল্যান” কার্যকর হয়। এটিও তাকসিম মসজিদ প্রকল্পের ভিত্তি। একই বছর এই পরিকল্পনা বাতিল করার জন্য জিহাঙ্গীর বিউটিফিকেশন অ্যাসোসিয়েশন এবং গালতা অ্যাসোসিয়েশন বেইওউলুর পৌরসভা, সংস্কৃতি ও পর্যটন মন্ত্রনালয় এবং ইস্তাম্বুল মহানগর পৌরসভার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করে। ইস্তাম্বুলের দশম প্রশাসনিক আদালত ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৩ এ সর্বসম্মতিক্রমে এই পরিকল্পনাগুলি বাতিল করেছে।

১৯৯৪ সালের মার্চ মাসে যখন এরদোগান স্থানীয় নির্বাচনের জন্য ইস্তাম্বুলের মেয়র পদে প্রার্থিতা ঘোষণা করেছিলেন, তখন তিনি তাকসিমের একটি ভবনের ছাদ থেকে ক্যামেরার মাধ্যমে বর্গক্ষেত্রটি দেখিয়ে বললেন, “এটি ২০ বছর আগে তাকসিম মসজিদের জন্য বিবেচিত সেই অঞ্চলটি, আমি আশা করি এই জায়গার ভিত্তি স্থাপনের সুযোগ পাব।”

একই বছরে, তিনি ইস্তাম্বুল মহানগর পৌরসভার মেয়র হওয়ার পরে টিআরটিতে রেহা মুহতারের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন, তখন তিনি মুহতারের “আপনি ইস্তাম্বুলের অবকাঠামোর পরিবর্তনের জন্য এজাহারে তাকসিম মসজিদকে কেন আনেন? সমস্যা কি আপনার? প্রশ্নের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে তিনি বলেন ” এই বিষয় নিয়ে আপনি যতটা কথা বলেন আমি তেমন কথা বলি না, প্রেস বলছে। এখানে একটি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সমিতি তার প্রস্তাব দিয়েছে, মহানগর প্রকল্পটি ব্যয় করেছে, আমার এর জন্য আলাদা কোন সময় নেই। অন্যথায়, তাকসিম মসজিদ এমন বিষয় নয় যা এই মুহূর্তে আমাকে আকৃষ্ট করবে।“
তারপরে, তিনি আবার আরেক ব্যাখ্যা দিয়ে বিতর্ককে বাড়িয়ে তুলেছিলেনঃ “আমি এর পক্ষে। তবে আমি এর জন্য অর্থ বরাদ্দ দেইনি, নাগরিক তা করবে।“ এই মসজিদ বিতর্কের বিশ বছর পরে, এরদোগান তুরস্কের দ্বাদশ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং তাকসিম মসজিদটি আবার আলোচনায় উঠে আসে।

এরদোগান এই প্রকল্পটির সূচনা করেছিলেন মেয়র থাকাকালীন। তবে রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন বিচারিক সিদ্ধান্তের কারণে তিনি কাজ আরম্ভ করতে পারেননি। ভিতরে এবং বাইরে থেকে আসা সমস্ত হুমকি এবং আক্রমণ সত্ত্বেও রাষ্ট্রপতির নির্দেশের মাধ্যমে ২০১৭ সালে তাকসিম মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছিল। এর পরেও Gezi Tayfası, TÜSAİD, KOÇ Group, DHKP-C, জার্মানি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ম্যাসোনিক সংগঠন এবং কয়েকটি বিরোধী দল একটি বিবৃতি দিয়েছে যে তারা কোন মসজিদকে তকসিমের অনুমতি দেবে না। কিন্তু শত বাধা সত্বেও তাকসিম মসজিদটি আজ দেড়শ বছর পরে এসে নির্মান কাজ সম্পন্ন করে ইবাদতের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। এই মসজিদটি শুধুমাত্র উপাসনার কেন্দ্র নয় “পেরা” অঞ্চলের বিজয়ের প্রতিক মনে করা হয়। কারণ যে জায়গায় ইসলামের দিকে এবং নামাজের দিকে আহবান করা হয় না তা ইসলামিক ভূমি হিসাবে গৃহীত হয় না। তাই এই বিষয়টি শুধুমাত্র তাকসিম মসজিদ নয়, সামগ্রিকভাবে ইসলাম বিজয়ী করার সংগ্রাম।

আয়া সোফিয়ার মতোই তাকসিম মসজিদ ইসলামের বিজয়ের প্রতীক। কারণ এই মসজিদটি সেই অটোমান সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে সুলতান আব্দুল হামিদ, আদনান মেন্ডেরেস, সুলেমান দেমিরেল, তুরগুত ওজাল এবং নাজমুদ্দিন এরবাকানের প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। অবশেষে রেজেপ তায়্যিপ এরদোয়ানের দৃঢ় মনোবল এবং সাহসী সিদ্ধান্তের ফলে শত বাধা বিপত্তির পরেও এই মসজিদ বাস্তবতায় রূপ পেলো।

মসজিদের বিস্তারিত তথ্যঃ
১. ২ হাজার ৪৮২ বর্গমিটার যায়গা জুড়ে অবস্থিত এই মসজিদটিতে একসাথে ৩ হাজার জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারবে। এবং মহিলাদের জন্য ৪৬৫ বর্গ মিটার যায়গা নিয়ে নামাজের স্থান তৈরি করা হয়েছে যাতে ৬২০ জন মহিলা একসাথে নামাজ আদায় করতে পারবে।
২. মসজিদটিতে ২ টি মিনার রয়েছে এবং মিনারের উচ্চতা ৬৪.৮০ মিটার করে।
৩. মসজিদের গম্বুজের উচ্চতা ৩৩ মিটার
৪. আর্কিটেক্ট হিসেবে ছিলেন শফিক বিরকিয়ে এবং সেলিম দালামান।
৫. ১৯ জানুয়ারি ২০১৭ সালে নির্মানকাজ শুরু হয় এবং দীর্ঘদিন অপেক্ষার পরে ২৮ মে ২০২১ সালে শুক্রবার স্বয়ং রেজেপ তায়্যিপ এরদোয়ানের অংশগ্রহনে এই মসজিদ নামাজের জন্য খুলে দেয়া হয়।

দেনমোহর নিয়ে ইসলাম যা বলে ======ইসলাম ধর্মে পালনীয় বিষয়ের মধ্যে বিয়ে অন্যতম এবং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর বিয়েতে ইসলাম যে সব নিয়ম-কানুন আরোপ করেছে, তন্মধ্যে দেনমোহর উল্লেখযোগ্য।দেনমোহর স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রীর একটি বিশেষ অধিকার। সাধারণত বর ও কনের সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী দেনমোহর নির্ধারিত হয়। মুসলিম বিয়েতে এটি একটি বাধ্যতামূলক শর্ত। দেনমোহর হিসেবে যেকোনো পরিমাণ অর্থ নির্ধারণ করা যায়। দেনমোহর নির্ধারণের সময় সামাজিক মর্যাদা এবং বাবার পরিবারের অন্যান্য নারী সদস্যের দেনমোহরের পরিমাণ বিবেচনা করতে হবে। তা ছাড়া প্রয়োজনে আদালতের মাধ্যমে দেনমোহর নির্ধারণ করা যায় কিংবা স্বামী কর্তৃক যেকোনো সময় দেনমোহরের পরিমাণ বৃদ্ধি করা যায়। মুসলিম বিয়েতে বিয়ের পর অবশ্যই স্ত্রীকে উপযুক্ত দেনমোহর দিতে হবে।পবিত্র কোরআন ও হাদিসে দেনমোহর দেওয়ার ব্যাপারে এবং এতে অবহেলা না করতে জোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিয়ের শর্ত হলো দেনমোহর, স্ত্রীর ভরণপোষণ, তার ইজ্জত-আবরুর হেফাজত ইত্যাদি। সুতরাং যথাসময়ে এসব পূরণ করতে হবে। পবিত্র কোরআনে দেনমোহর আদায়ের বিষয়ে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা নারীদেরকে সন্তুষ্টচিত্তে মোহর প্রদান করো।’ -সূরা নিসা: ৪ইসলামে মোহরমুক্ত কোনো বিয়ের অস্তিত্ব নেই। কেননা মোহর বিয়ের জন্য আবশ্যকীয় বিধানের একটি। বিয়ের সময় যদি মোহরের কথা উল্লেখ নাও করা হয় তথাপি মোহর আবশ্যক। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) জীবনে যে এগারোটি বিয়ে করেছিলেন, তার সবগুলোতেই তিনি মোহর সুচারুভাবে প্রদান করেছেন। এমনিভাবে সাহাবারাও নিজ স্ত্রীদের মোহর প্রদানে গড়িমসি করেননি। মোহরের গুরত্ব সম্পর্কে প্রচুর হাদিস বর্ণিত হয়েছে।দেনমোহরের বিষয়টি হালকাভাবে নিয়ে লোক দেখানো ‘অধিক মোহর’ ধার্য করাতে কোনো বরকত নেই। বরং তা অহংকারের পরিচায়ক। বরকতপূর্ণ বিবাহের বর্ণনা দিতে গিয়ে উম্মাহাতুল মুমিনীন হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘সবচেয়ে বরকতময় বিয়ে হচ্ছে সুন্নতি বিয়ে, অর্থাৎ যে বিয়েতে খরচ কম হয় এবং কোনো জাঁকজমক থাকে না।’ -মিশকাত শরিফকোরআনের আয়াত ও হাদিস দ্বারা স্পষ্ট বুঝা যায়, দেনমোহর পুরুষের ওপর স্ত্রীর ঋন এবং এটা আদায় করা ওয়াজিব। অতএব তা আদায় না করলে স্বামী গোনাহগার হবেন এবং স্ত্রীর নিকট এই ঋণ অবশিষ্ট থেকে যাবে। তবে হ্যাঁ, যদি স্ত্রী স্বেচ্ছায় মোহরের দাবী ছেড়ে দেয়, তবে স্বামীর ওপর এর বাধ্যকতা অবশিষ্ট থাকবে কিন্তু স্ত্রীকে মোহর ক্ষমা করে দেওয়ার ব্যাপারে বাধ্য করা কিংবা মোহর আদায় করতে অস্বীকৃতি জানানো- অমার্জনীয় অপরাধ।এ প্রসঙ্গে কোরআনে ইরশাদ হয়েছে,وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً ۚ فَإِنْ طِبْنَ لَكُمْ عَنْ شَيْءٍ مِنْهُ نَفْسًا فَكُلُوهُ هَنِيئًا مَرِيئًاওয়া আ-তুন নিছাআ সাদুকা-তিহিন্না নিহলাতান ফাইন তিবনালাকুম ‘আন শাইইম মিনহু নাফছান ফাকুলূহু হানীআম মারীআ।আর তোমরা স্ত্রীদেরকে তাদের মোহর দিয়ে দাও খুশীমনে। তারা যদি খুশী হয়ে তা থেকে অংশ ছেড়ে দেয়, তবে তা তোমরা স্বাচ্ছন্দ্যে ভোগ কর।——–সূরা নিসা: ৪দেনমোহর পরিশোধের ব্যাপারে আমাদের মধ্যে রয়েছে চরম অজ্ঞতা কিংবা সজ্ঞান উদাসীনতা। নিয়মিত নামাজ-রোজা আদায় করেন এমন অনেক মানুষও দেনমোহরের বিষয়ে সচেতন নন। এ বিষয়ে উদাসীনতা এতো প্রকট যে, তারা নফল নামাজ পড়াকে যতোটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন,স্ত্রীর মোহর আদায়কে তার সিকিভাগও গুরুত্ব দেন না।এ ছাড়া দেনমোহর নিয়ে আরও ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। যেমন বরের এক লাখ টাকা দেনমোহর পরিশোধের ক্ষমতা আছে, কিন্তু কাবিননামায় কনে পক্ষের সামাজিক মর্যাদা রক্ষার অজুহাতে জোরপূর্বক লেখানো হয় আরও বেশি। কনেপক্ষ ভাবে, মোহরানার অর্থ বেশি হলে বর কখনও কনেকে তালাক দিতে পারবে না। আর ছেলের পক্ষ ভাবে, যতো খুশি মোহরানা লিখুক। ওটা তো আর পরিশোধ করতে হবে না। এমন মনোভাব কোনোভাবেই কাম্য নয়।মোহর পরিশোধ না করার নিয়তে যে স্বামী অধিক পরিমাণ মোহর নির্ধারণপূর্বক স্ত্রীকে বিয়ে করে তার সঙ্গে দাম্পত্য জীবন শুরু করে, সেটা আসলে প্রতারণার মাধ্যমে দাম্পত্য জীবন শুরুর শামিল। কেননা, দেনমোহরের কারণেই স্ত্রী তার স্বামীর জন্য হালাল হয়েছিল। অতএব দেনমোহরই যেখানে পরিশোধ করা হলো না, সেখানে স্ত্রীর সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক হালাল হয় কিভাবে?অনেক স্বামী আবার মনে করেন, স্ত্রীর ভরণ-পোষণসহ যাবতীয় ব্যয়ভার তো তিনিই বহন করছেন। অতএব এর মধ্যে আবার আলাদা করে তাকে মোহর পরিশোধ করতে হবে কেন? না, মোহরের সঙ্গে ভরণপোষণের কোনো সম্পর্ক নেই। দু’টি সম্পূর্ণ আলাদা অধিকার, দু’টোই স্বামীকে বহন করতে হবে।দেনমোহর দুই প্রকার। একটি তাৎক্ষণিক দেনমোহর, যা স্ত্রীর চাওয়ামাত্র পরিশোধ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্ত্রী তাৎক্ষণিক দেনমোহর না পাওয়া পর্যন্ত স্বামীর সঙ্গে দাম্পত্য জীবন শুরু করতে অস্বীকার করতে পারেন।আরেকটি হচ্ছে বিলম্বিত দেনমোহর। বিলম্বিত দেনমোহর বিবাহবিচ্ছেদ অথবা স্বামীর মৃত্যুর পর পরিশোধ করতে হয়। এ ছাড়া স্বামী সালিসিপরিষদের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে স্ত্রীকে বিলম্বিত দেনমোহর পরিশোধ করতে হবে।সাধারণত দেনমোহরের কিছু পরিমাণ বিয়ের সময় তাৎক্ষণিক দেনমোহর হিসেবে দেওয়া হয় এবং তা কাবিননামায় লিখিত থাকে। বাকিটা বিলম্বিত দেনমোহর হিসেবে ধরা হয়।আইন অনুযায়ী দেনমোহর স্বামীকে অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে। কারণ, দেনমোহর সব সময়ই স্বামীর ঋণ। স্ত্রী পারিবারিক আদালতে মামলা করে দেনমোহর আদায় করতে পারবেন। দেনমোহর দাবি করার পর স্বামী ওই দাবি পরিশোধ না করলে স্ত্রী স্বামীর কাছ থেকে পৃথক থাকতে পারবেন এবং ওই অবস্থায় স্বামী অবশ্যই তার ভরণপোষণ করতে বাধ্য থাকবেন।এ ছাড়া বিয়ে বিচ্ছেদ হলে বা স্বামীর মৃত্যু হলে স্ত্রী তার দেনমোহর আদায়ের জন্য পারিবারিক আদালতে মামলা করে তা আদায় করতে পারেন। স্বামীর মৃত্যু হলেও বকেয়া দেনমোহর একটি ঋণের মতো। এটি শোধ করতেই হয়। স্বামীর উত্তরাধিকারীরা এটি প্রদানে বাধ্য। অন্যথায় মৃত স্বামীর উত্তরাধিকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করে আদায় করা যায়।এমনকি স্ত্রী আগে মারা গেলেও দেনমোহর মাফ হয় না। স্ত্রীর উত্তরাধিকারীরা এই দেনমোহরের হকদার। তারাও মামলা করার অধিকার রাখেন।দেনমোহর নির্ধারণ হয় দু’পক্ষের আলোচনার ভিত্তিতে। এর সর্বনিম্ন পরিমাণ নির্ধারিত আছে; সর্বোচ্চ পরিমাণের কোনো সীমা নেই। এই যে ‘দু পক্ষের আলোচনা’ -এরও একটা ভিত্তি থাকে। তা হলো, পরিবারের সমপর্যায়ের অন্যান্য মহিলাদের দেনমোহর -যেমন, চাচী, ফুফু, খালা, বোন ইত্যাদি। রূপে, গুণে তারা যদি সমান হয়, তাহলে তাদের দেনমোহরের সাথে মিল রেখে একটা অঙ্ক নির্ধারণ করা যেতে পারে।ইসলাম দেনমোহরের বিধান দিয়েছে নারীর জীবনের সিকিউরিটির জন্য। কোনো কারণে দাম্পত্য বন্ধন ভেঙে গেলে যেন তাকে পথে বসতে না হয় -সে জন্যই এ ব্যবস্থা। আমার অন্য এক লেখায় এটাকে অনেকটা লাইফ ইন্সুরেন্সের সাথে তুলনা করেছিলাম।দেনমোহর নারীর অধিকার। এ থেকে তাকে বঞ্চিত করা যায় না। এ জন্যই বিবাহে কেউ যদি দেনমোহর নির্ধারণ নাও করে, কিংবা, এরকম বলে যে, ‘এ বিবাহে কোনো দেনমোহর থাকবে না’ -তবু তাতে দেনমোহর দিতে হয়।দেনমোহর নির্ধারণের সময় সঙ্গতিপূর্ণ দেনমোহর নির্ধারণ করা উচিৎ। শুধু লোক দেখানোর জন্য কোটি টাকা দেনমোহর নির্ধারণ করা, এরপর, প্রথম রাতেই ৯৯ লক্ষ ৯৯ হাজার টাকা মাফ করিয়ে নেয়া- এগুলো মানবতা বিবর্জিত ঘৃণিত কাজ। অতএব শুধু অঙ্কের দিকে না তাকিয়ে সামর্থ্যের দিকেও তাকানো উচিৎ।মনে রাখা উচিৎ, নবীজী স. তাঁর স্ত্রী, কণ্যাদের ক্ষেত্রে কত অল্প অঙ্ক নির্ধারণ করেছিলেন। কাজেই কম মোহরানা নির্ধারণ কোনো সম্মানহানীর বিষয় নয়। আবার মোটা অঙ্ক নির্ধারণও কোনো গর্বের বিষয় নয়। এটা কোনো সওদা বা কেনা বেচা নয় যে যত বেশি মূল্য ধরা হবে, তত মান বাড়বে।