আস সালামু আ’লাইকুম ওয়া রহ’মাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
মুসলিম নারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছিঃ
.
অধ্যায়ঃ নারীদের বিষয়াবলী (পর্ব-৩)
(৫) মুসলমান মেয়েরা কি টি-শার্ট, ফতোয়া বা জিন্সের প্যান্ট পরতে পারে?
(৬) ভ্রু প্লাক করা ও শরীরে ট্যাটু অংকন করা শুধু গুনাহ নয়, বরং কবীরা গুনাহ
____________________________________
মুসলমান মেয়েরা কি টি-শার্ট, ফতোয়া ও জিন্সের প্যান্ট পরতে পারে?
মেয়েদের মধ্যে বিশেষ করে কলেজ-ইউভার্সিটি পড়ুয়া, বাংলা বা ইংরেজী শিক্ষিত এমন তরুণীরা নিজেদেরকে স্মার্ট ও আধুনিকা প্রমান করার জন্য বডি ফিটিং বা টাইট এমন ফতুয়া, গেঞ্জি, জিন্সের প্যান্ট, লেগিংস ইত্যাদি পুরুষদের পোশাক কিংবা পুরুষদের জন্যে যৌন উত্তেজনা সৃষ্টিকারী অমুসলিম মহিলাদের পোশাক পরিধান করে থাকে। এধরণের পোশাক পরিধান করার পাপ কয়েক প্রকারঃ
.
(১) পুরুষদের পোষাক পড়াঃ নারীদের জন্যে পুরুষের পোশাক পরিধান করা এবং পুরুষদের জন্যে নারীদের পোশাক পরা হারাম, কবীরাহ গুনাহ ও অভিশপ্ত একটা কাজ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম সেই পুরুষদের উপর অভিশাপ দিয়েছেন, যারা নারীদের পোষাক পরিধান করে। আর তিনি সেই সমস্ত নারীদের উপর অভিশাপ দিয়েছেন, যারা পুরুষদের পোশাক পড়ে। সহীহ বুখারীঃ ৫৮৮৫, আবু দাউদ, মিশকাত ৪৪৬৯।
.
(২) ফাহেশা বা অশ্লীলতাঃ ইয়াহুদী, খ্রীস্টান ও হিন্দু ও মুশরেক মহিলাদের মতো শরীর উন্মুক্ত রাখা ও শরীরের গঠন বা অবয়ব ও সৌন্দর্য প্রকাশ করে বাইরে বের হওয়া, স্বচ্ছ বা মশারির কাপড়ের মতো পোশাক পরা, পেট পিঠ উন্মুক্ত রাখা ‘ফাহেশাহ’ বা অশ্লীল কাজের অন্তর্ভুক্ত। তাবাররুজ অর্থাৎ, নারীদের শারীরিক সৌন্দর্য প্রদর্শ করে বাইরে বের হওয়া ইসলাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে, এবং একে ‘জাহেলী’ (শিরক ও অন্ধকার যুগের) একটা কাজ বলে আখ্যা দিয়েছে। আল্লাহ তাআ’লা বলেন, “আর তোমরা গৃহে অবস্থান করবে, জাহেলিয়াতের (মূর্খতা যুগের) মত তাবাররুজ (নিজেদেরকে প্রদর্শন) করবে না। তোমরা সালাত কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করবে।” সুরা আল-আহজাবঃ ৩৩।
.
(৩) কাফের মহিলাদের অনুকরণ করাঃ মানুষ যাদেরকে ভালোবাসে, তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। নারীদের খোলামেলা ও যৌন উত্তেজক পোশাক পরিধান করা, মুসলমানদের মাঝে এটা মূলত আধুনিক যুগের পাশ্চাত্য ইয়াহুদী ও খ্রীস্টান সভ্যতার অবদান। কাফেরদের সংস্কৃতিকে ভালোবেসে বা সেইগুলোকে ভালো মনে করে মুসলমানদের মাঝে যারাই সেগুলোর অনুকরণ করবে, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম তার ভয়াবহতা সম্পর্কে বলেছেন, “যে ব্যক্তি যাকে ভালোবাসবে, কেয়ামতের দিন সে তার সাথেই (জান্নাতে বা জাহান্নামে) থাকবে।” তিরমিযী, ২৩৮৮।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম আর বলেছেন, “মান তাশাব্বাহা বি ক্বাওমিন ফাহুয়া মিনহুম”। অর্থাৎ, কোন ব্যক্তি যেই জাতির অনুকরণ করবে, সে সেই জাতির অন্তর্ভুক্ত বলেই গণ্য হবে। সুতরাং যারা হিন্দুদের অনুকরণ করবে, তারা হিন্দুদের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে, যারা ইয়াহুদী-খ্রীস্টানদের অনুকরণ করবে, তারা ইয়াহুদী-খ্রীস্টানদের অন্তর্ভুক্ত বলেই গণ্য হবে।
.
(৪) ওড়না না পড়ে বুক উন্মুক্ত রাখাঃ ঘর থেকে বাইরে বের হলে নারীদের হিজাবের (স্কার্ফ বা মাথার ছোট্ট একটা রুমাল নয়। হিজাব হচ্ছে, নারীদের নিয়মিত পোশাকের উপরে অন্য একটা লম্বা ও ঢোলা কাপড় দিয়ে সারা শরীর সম্পূর্ণ ঢাকে, এমন বোরখা বা জিলবাব), তার উপরে অতিরিক্ত একটা কাপড় দিয়ে বুক ঢেকে রাখার আদেশ আল্লাহ ক্বুরআনেই উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তাআ’লা বলেন, “(হে নবী আপনি) ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাযত করে। তারা যেন যা সাধারণত প্রকাশমান, তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না ‘জুয়ুবিহিন্নাহ’ (শরীর, চেহারা, ঘাড় ও বুকের) উপর ফেলে রাখে।” সুরা নূরঃ ৩১।
যাইহোক, এই নিকৃষ্ট কাজে লিপ্ত মেয়েগুলো সাবালিকা হলে, তারা স্বেচ্ছায়, সজ্ঞানে আগুনে যাওয়ার দিকে হাঁটছে। তবে তাদের বাবা বা পুরুষ গার্জিয়ানেরাও তাদের এহেন নির্লজ্জতার জন্য দায়ী থাকবে। কেননা, একটা মেয়েকে ছোটবেলা থেকে হিজাব-পর্দা শিক্ষা দেওয়া, ইসলামী বিশ্বাস ও সংস্কৃতি ও সভ্যতায় বড় করে তোলা তার বাবা-মায়ের জন্য ফরয। তারা যদি এই কাজ না করে, উলটা নিজের মেয়েকে কাফের নারীদের মতো অশ্লীল কাপড়-চোপড় কিনে দেয় বা টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করে, তার মেয়ে লম্পট পুরুষদের কামনার বস্তু হয়ে ঘুরে বেড়ায় আর সে চুপ করে বসে থাকে, তাহলে ইসলামে এধরণের পুরুষদেরকে “দাইয়ুস” বলা হয়। আর দাইয়ুসের জন্য জান্নাত হারাম, হারাম এবং হারাম।
.
দুর্ভাগ্যের ব্যপার হচ্ছে, এমন অনেক আংকেলকে দেখা যায়, যাদের লম্বা দাড়ি ধবধবে সাদা হয়ে আছে, সিজদা দিতে দিতে কপালে কালো দাগ পড়ে গেছে। কিন্তু তার মেয়েদেরকে চরিত্রহীনা মেয়েদের মতো বেয়াহাপনা ও খোলামেলা ছেড়ে দিয়েছেন। আবার বোকা শ্রেণীর কিছু মহিলা আছে, তারা যখন মেয়েকে নিয়ে বাইরে বের হন, তিনি নিজে ঠিকই বোরখা পড়েন, কিন্তু তার কিশোরী বা তরুণী মেয়েকে পুরুষদের জন্য প্রদর্শনীর বস্তু বানিয়ে বের হন। খুব ইচ্ছা হয় এই সমস্ত আকলহীন আন্টিদেরকে বলি, একটা পুরুষ চল্লিশোর্ধ-পঞ্চাশোর্ধ নারীর দিকে খারাপ দৃষ্টি দেওয়ার সম্ভাবনা এমনিতেই কম। আর তরুণী একটা মেয়ে নিকাব পড়ে বের হলেও, পুরুষেরা চেষ্টা করবে একটু দেখার জন্যে। আপনার যদি টাকা-পয়সার অভাব থাকে যে আপনার একটা মাত্র বোরখা কেনার সামর্থ্য আছে, তাহলে আপনার বোরখাটা আপনার থেকে আপনার মেয়ের জন্যি বেশি জরুরী। এই সমস্ত অজ্ঞ ও বোকাশ্রেণীর বাবা-মায়ের কারণে বর্তমানে মুসলমান ছেলে মেয়েরা জাহেল ও পাপীষ্ঠ হয়ে বড় হয়। এভাবেই এরা দ্বীন থেকে দূরে থেকে কেয়ামতের দিন জাহান্নামের আগুনে প্রবেশ করবে। আল্লাহ আমাদের ও আমাদের পরিবারকে নিরাপদে রাখুন, আমিন।
.
দাইয়ুস কথাটির ব্যখ্যাঃ
দাইয়ুস হচ্ছে, যে নিজ পরিবারে যিনা-ব্যভিচার ও অশ্লীলতার কাজকে প্রশ্রয় দেয়। যে পুরুষ ঘরের নারীদের সম্ভ্রম রক্ষায় আত্মসম্মানী নয়, সে মানবিকতাহীন, অপুরুষত্ব, অসুস্থ মস্তিষ্ক এবং দুর্বল ঈমানের অধিকারী। তার তুলনা অনেকটা শূকরের মতো, যে নিজ সম্ভ্রম রক্ষা করে না। তাই ওই সব লোককে সতর্ক থাকা উচিত, যারা নিজ পরিবারে এবং তার দায়িত্বে থাকা লোকদের মাঝে অশ্লীলতা বা অশ্লীলতার উপকরণ প্রশ্রয় দেয়। যেমন বাড়িতে এমন টিভি চ্যানেল রাখা যা যৌনতা উস্কে দেয় এবং অশ্লীলতা বৃদ্ধি করে।
.
অধিকাংশ নারী বেপর্দা ও চরিত্রহীনা হওয়ার জন্যে তাদের পিতা, স্বামী বা পুরুষ গার্জিয়ানের উদাসীনতা দায়ী। এদের পরিণত হবে ভয়াবহ। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “এমন তিনজন ব্যক্তি আছে, যাদের দিকে আল্লাহ আ’যযা ওয়া যাল কিয়ামাতের দিন তাকাবেন না। তারা হচ্ছে (১) যে পিতামাতার অবাধ্য, (২) যে নারী বেশভূষায় পুরুষদের অনুকরণ করে এবং (৩) দাইয়ুস ব্যক্তি।” নাসায়ীঃ ২৫৬২, হাসান সহীহ, শায়খ আলবানী।
.
ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “দাইয়্যুস হচ্ছে এমন পুরুষ যার কোন ঘীরাহ (Protective jealousy) নেই।” মাজমু আল-ফাতাওয়াঃ ৩২/১৪১।
.
স্থায়ী কমিটির ফাতওয়াঃ “দাইয়ুস শব্দটি এমন ব্যক্তিকে নির্দেশ করে, যে তার অধিকারভুক্ত কোন নারীকেই, হোক তা তার স্ত্রী, কন্যা, বোন এবং অন্যদের যিনা করা থেকে বিরত রাখেনা, তা সরাসরি জিনাই হোক, আর এমন সব কাজ হোক যা জিনার দিকে নিয়ে যায়, যেমন গায়ের মাহরামের উপস্থিতিতে প্রকাশ্যে যেসব আওরা (শরীরের অংশ) ঢেকে রাখতে হয়, তা প্রকাশ করা, গায়ের মাহরাম এর সাথে একাকী অবস্থান করা, ঘর থেকে বের হওয়ার সময় দেহে সুগন্ধি লাগানো, আর অন্যান্য কাজ যা ফিতনা আর অপরাধ সৃষ্টি করতে পারে।”
____________________________________
ভ্রু প্লাক করা ও শরীরে ট্যাটু অংকন করা শুধু গুনাহ নয়, বরং কবীরা গুনাহ
আজকাল অনেক নারীরা, এমনকি অনেক নামাযী মহিলারাও ভ্রু প্লাক করছে। অথচ, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম যারা ভ্রু প্লাক করে, তাদেরকে ‘লানত’ বা অভিশাপ করেছেন। সহীহ বুখারীঃ ৪৮৮৬।
আপনি ভ্রু প্লাক কার জন্য করছেন? বাসায় যারা আছে তাদের জন্য? I don’t think so. মানুষ সাধারণত নায়ক নায়িকা, গায়ক গায়িকা, এমন “সো কলড” সেলেব্রিটির দেখে প্রভাবিত হয়ে তাদের ফ্যাশান নকল করার চেষ্টা করে, যদিও ঐ সমস্ত নায়িকা বা গায়িকারা যে চরিত্রহীনা ও ব্যভিচারিণী, বর্তমান যুগের সকলেরই তা জানা আছে। এইভাবে মিডিয়ার পাল্লায় পড়ে আধুনিক যুগের দুর্বল ঈমান ও ইলমহীন নারীরা আসলে মডার্ণ যুগের প্রস্টিটিউটদেরকে ফলো করছে।
যা বলছিলাম, আপনি নিশ্চয়ই আপনার মা-বাবা বা ভাই-বোনদেরকে দেখানোর জন্য ভ্রু প্লাক করছেন না? তাহলে কার জন্য? বাইরের দুনিয়ার পর পুরুষদের জন্য? অথচ তাদের সামনে সাজ-গোজ করে যাওয়াতো দূরের কথা, আপনার জন্য নিকাব ছাড়া তাদের সামনে যাওয়াই নিষিদ্ধ। কথাগুলো বুঝানোর উদ্দেশ্যেই বলা, কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি। আমাদের মা বোনেরা আমদের সম্মান, আল্লাহ আমাদের মা বোনদের হেফাজত করুন।
আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম আরো যাদের লানত বা অভিশাপ করেছেন তারা হলোঃ যারা দেহে উল্কি অংকন করে এবং অন্যকে উলিক এঁকে দেয়, সৌন্দর্যের জন্য দাঁতের মাঝে ফাঁক সৃষ্টি করে, যারা আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে পরিবর্তন আনে, যারা পরচুলা পড়ে ও অন্যকে পরচুলা পরতে বলে।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আ’নহু কর্তৃক বর্ণিত। তিনি বলেন, “আল্লাহর অভিশাপ হোক সেই সবনারীদের উপর, যারা শরীরে উল্কি (ট্যাটু) অংকন করে এবং যারা করায়, এবং তাদের উপর (আল্লাহর অভিশাপ), যারা ভ্রু চেঁছে সরু (প্লাক) করে, যারা সৌন্দর্য মানসে দাঁতের মাঝে ফাঁক সৃষ্টি করে, যারা আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে পরিবর্তন আনে।” জনৈক মহিলা এ ব্যাপারে তার (ইবনে মাসউদের) কথার প্রতিবাদ করলে তিনি বলেন, “আমি কি তাকে অভিসম্পাত করব না, যাকে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম অভিসম্পাত করেছেন এবং তা আল্লাহর কিতাবে আছে? আল্লাহ বলেছেন, “রাসুল যে বিধান তোমাদেরকে দিয়েছেন তা গ্রহণ করো, আর যা থেকে নিষেধ করেছেন, তা থেকে বিরত থাক (সুরা হাশরঃ ৭)।” সহীহ বুখারীঃ ৪৮৮৬।
আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রাদিয়াল্লাহু আ’নহু হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম যে মহিলা পরচুলা লাগিয়ে দেয় এবং যে পরচুলা লাগাতে বলে, আর যে মহিলা অঙ্গ প্রত্যঙ্গে উল্কি অংকন করে ও অন্যকে উল্কি অংকণ করতে বলে, তাদেরকে অভিশাপ করেছেন।” সহীহ বুখারীঃ ৫৯৩৭।
____________________________________