ফেতরা

প্রতি রমযানেই একটি বিষয় নজরে আসে। বিভিন্ন জায়গা থেকে ঘোষণা আসে এবারের সাদাকাতুল ফিতর ৬০/৭০ (অথবা এর কাছাকাছি) টাকা। অর্থাৎ গমের হিসাবে সাদাকাতুল ফিতরের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। কোন কোন মসজিদে জুমুআর বয়ানেও এভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়। বিভিন্ন মসজিদের ইমাম সাহেবকে অনেকে জিজ্ঞাসা করেন। তাঁরাও ধণী, মধ্যবিত্ত নির্বিশেষ সবাইকে গমের হিসাবে সাদাকাতুল ফিতরের পরিমাণ বলে দেন।

অথচ হাদিসে শুধু গম নয়; বরং পাঁচ প্রকার খাদ্যের কথা বর্ণিত হয়েছে। খেজুর, কিসমিস, পনির, যব ও গম। এগুলোর মধ্যে খেজুর, কিসমিস, পনির ও যব দ্বারা সদকায়ে ফিতর আদায় করতে চাইলে প্রত্যেকের জন্য এক সা’ দিতে হবে। আর গম দ্বারা আদায় করতে চাইলে আধা ‘সা’ দিলে হয়ে যাবে।

হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. বলেন, আমরা সদকাতুল ফিতর আদায় করতাম এক ‘সা’ খাদ্য দ্বারা অথবা এক ‘সা’ যব অথবা এক ‘সা’ খেজুর, কিংবা এক ‘সা’ পনির বা এক ‘সা’ কিসমিস দ্বারা। -সহিহ বুখারি, হাদিস ১৪৭২; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৬১

  • এক সা = ৩২৭০.৬০ গ্রাম (প্রায়) অর্থাৎ ৩ কেজি ২৭০ গ্রামের কিছু বেশি।
  • আধা সা = ১৬৩৫.৩১৫ গ্রাম বা ১.৬৩৫৩১৫ কেজি (প্রায়) অর্থাৎ ১ কেজি ৬৩৫ গ্রামের কিছু বেশি।

ভগ্নাংশের হিসাবের ঝামেলায় না গিয়ে সহজে আধা সা এর পরিমাণ পোঁনে দু’কেজি বলে দেওয়া হয়।

আমরা যদি ঐ পাঁচ বস্তুর পরিবর্তে টাকা দিয়ে সদকায়ে ফিতর আদায় করতে চাই তাহলে একজনের সদকায়ে ফিতর কত পড়তে পারে? দেখনু-
এক.
খেজুর: বাজারে অনেক রকমের খেজুর আছে। আমরা এগুলোকে তিনভাগে ভাগ করতে পারি। উন্নত মানের, মধ্যম মানের, নিম্ন মানের।

ক. উন্নতমানের খেজুর: পড়বে ৮০০/- থেকে ১০০০/-টাকা এহিসেবে এক সা‘ সমান ৩.২৭০ কেজি খেজুরের দাম পড়বে ৩০০০/- টাকারও উপরে।

খ. মধ্যম মানের খেজুর: মূল্য প্রতি কেজি ৪০০-৫০০/- টাকা। এহিসেবে এক সা‘ সমান ৩.২৭০ কেজি খেজুরের দাম পড়বে ২০০০/- কাছাকাছি।

গ. সাধারণ খেজুর: মূল্য প্রতি কেজি ২০০-৩০০/- টাকা। এহিসেবে এক সা‘ সমান ৩.২৭০ কেজি খেজুরের দাম পড়বে ১০০০/-টাকারও কাছাকাছি।

দুই.
কিসমিস: প্রতি কেজি ৩০০/- টাকা করে হলে এক সা‘ সমান ৩.২৭০ কেজি কিসমিসের দাম পড়বে প্রায় ১২০০-১৩০০ টাকা।

তিন.
পনির: প্রতি কেজি ৫০০-৬০০/- টাকা করে ধরা হলে এক সা‘ সমান ৩.২৭০ কেজি পনিরের দাম পড়বে প্রায় ২০০০/- টাকা।

চার.
যব: আমাদের দেশে সাধারণত এর প্রচলন নেই।

পাঁচ.
গম: প্রতি কেজি ৩৫-৩৬/= টাকা হলে ১ কেজি ৬৩৫ গ্রামের দাম প্রায় ৬০ টাকা।

এখানে আনুমানিক একটা হিসবা উল্লেখ করা হয়েছে। আপনি ঐ পাঁচটি পণ্যের বাজার দর যাচাই করে একজনের সদকায়ে ফিতর কত পড়বে নিজে নিজেই বের করতে পারবেন।

এবার চিন্তু করে দেখুনতো সর্বোচ্চ মানের বস্তু দিয়ে সদকায়ে ফিতর আদায় করতে হলে জনপ্রতি ৩০০০-৩৫০০/- টাকা পড়ে। অথচ আমরা ধনী গরিব নির্বিশেষ সবাই গমের হিসাবেই সাদাকাতুল ফিতর আদায় করে যাচ্ছি। রমজানের বাহারি ইফতার এবং ঈদের স্পেশাল শপিং এগুলোর মধ্যে ধনীদের সাথে অন্যদের বিশাল পার্থক্য থাকলেও সাদাকাতুল ফিতর আদায়ের সময় আমরা সবাই সমান হয়ে যাই!!

আজকে যদি ধনীরা সর্বোচ্চ মানের খেজুর কিংবা এর মূল্য দিয়ে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করতেন তাহলে একদিকে যেমন হাদিসের উপর আমল করার কারণে বেশি সওয়াব পেতেন অপরদিকে গরিবেরও বেশ উপকার হতো। যাকাতের মাধ্যমে যেমন তাদের বড় একটা সহযোগিতা হয় সাদাকাতুল ফিতরের মাধ্যমেও তাদের বড় একটা সহযোগিতা হতো।

হাদিসে এই ৫টি দ্রব্যের যেকোনো একটি দ্বারা ফিতরা আদায়ের যে সুযোগ দেওয়া হয়েছে এটা তো এজন্যই যেন মুসলমানগণ নিজ নিজ সামর্থ্য ও সুবিধা অনুযায়ী এর যেকোনো ১টি দ্বারা তা আদায় করতে পারে। এখন যদি সকল শ্রেণীর লোক সবচেয়ে নিম্ন মূল্য-মানের দ্রব্য দিয়েই নিয়মিত সদকায়ে ফিতর আদায় করে তবে হাদিসে বর্ণিত অন্য চারটি দ্রব্যের হিসেবে ফিতরা আদায়ের উপর আমল করবে কে?

সুতরাং যার যেটা দিয়ে আদায় করা তওফিক আছে সে সেটি দিয়েই আদায় করবে। এটিই্ উত্তম নিয়ম। এ নিয়মই ছিল নবী, সাহাবা-তাবেঈন ও তাবে তাবেঈনের স্বর্ণযুগে।

উপরে উদ্ধৃত হাদিসটি আরেকটু মনোযোগ সহকারে দেখুন তো হযরত আবু সাঈদ রা. নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগের কথা বলেছেন। সেই সময়ে সাহাবিগণ ধনী গরিব নির্বিশেষ গম দিয়ে সদকায়ে ফিতর আদায় করতে না; বরং প্রত্যেকে তওফিক অনুযায়ী খেজুর, কিসমিস, পনির, যব, গম দিয়ে একেক জনে একেকটা দিয়ে আদায় করতেন।

একটি হাদিসে কিংবা আসারে কোন দুর্বল সূত্রেও একথার কোনই প্রমাণ নেই যে, স্বর্ণযুগের কোনো সময়ে সব শ্রেণীর সম্পদশালী সর্বনিম্ন মূল্যের দ্রব্য দ্বারা সদকা ফিতর আদায় করেছেন।

%d bloggers like this: